শেয়ার বাজার

সূর্যগ্রহণের সময় গাড়ি দুর্ঘটনায় মারা যেতে পারে হাজারো মানুষ!

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশিত: রবিবার, ৩১ মার্চ ২০২৪

সূর্যগ্রহণের সময় গাড়ি দুর্ঘটনায় মারা যেতে পারে হাজারো মানুষ!

প্রায় ৫৪ বছর পর আগামী ৮ এপ্রিল বছরের প্রথম সূর্যগ্রহণ। সূর্যগ্রহণটি পূর্ণগ্রাস সূর্যগ্রহণ হতে চলেছে, নাসার বিজ্ঞানীরা এই সূর্যগ্রহণকে ‘বিশেষ’ বা বিরল ঘটনা বলে বর্ণনা করেছেন। এর আগে ১৯৭০ সালে এমন সূর্যগ্রহণ হয়েছিল, আবার হতে পারে ২০৭৮ সালে। এইদিন চাঁদ সূর্যকে সম্পূর্ণরূপে ঢেকে রাখার কারণে যুক্তরাষ্ট্রের বেশ কয়েকটি রাজ্যে দিনের বেলাতেও অন্ধকারে ঢেকে থাকবে। ফলে বিজ্ঞানীরা আশঙ্কা করছেন যে, এইদিন শতাধিক গাড়ি দুর্ঘটনা ঘটতে পারে এবং এইসব দুর্ঘটনায় মারা যেতে পারেন সহস্রাধিক মানুষ। 

ডেইলি মেইলের প্রতিবেদন জানিয়েছে, কানাডার ইউনিভার্সিটি অব টরোন্টের একদল গবেষক ২০১৭ সালের সূর্যগ্রহণের সময়ের তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণ করে বলেছেন, সূর্যগ্রহণের তিন দিন আগে এবং পরে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে হাজারেরও বেশি মানুষ সড়ক দুর্ঘটনায় মারা গেছেন।

 গবেষকরা জানান, যুক্তরাষ্ট্রে এখন প্রতিদিন গাড়ি দুর্ঘটনায় ১১৪টি মৃত্যু ঘটে। এখন থেকে সাত বছর আগে (২০১৭) সূর্যগ্রহণের সময় দৈনিক ১৮৯টি মৃত্যু ঘটেছিল। যা স্বভাবিক সময়ের চেয়ে অন্তত ৩১ শতাংশ বেশি।

ডেইলি মেইলের প্রতিবেদন মতে, সূর্যগ্রহণের সময় যুক্তরাষ্ট্রে এবার প্রায় ৩৭ লাখ মানুষ সূর্যগ্রহণ দেখার জন্য রাস্তায় নামবে। তারা যেসব এলাকা থেকে ভালভাবে সূর্যগ্রহণ দেখা যাবে সেসব এলাকায় যাওয়ার চেষ্টা করে।  ওই সময় চারদিকে অন্ধকার থাকায় গাড়ি দুর্ঘটনায় মৃত্যুর সংখ্যা ৫০ শতাংশ বৃদ্ধির আশঙ্কা করা হচ্ছে।

 জানা গেছে, বিরল পূর্ণগ্রাস সূর্যগ্রহণের কারণে ৮ এপ্রিল মেক্সিকো, যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডায় সূর্যকে পুরোপুরি ঢেকে ফেলবে চাঁদ। ফলে দিন হবে রাতের মতো অন্ধকার। সুর্যগ্রহণের কারণে এই রাজ্যগুলোর অনেক স্কুল ইতিমধ্যেই বন্ধ ঘোষণা করেছে কর্তৃপক্ষ।

 মার্কিন মহাকাশ গবেষণা সংস্থা নাসা বলছে, আগামী ৮ এপ্রিল স্থানীয় সময় বেলা ১১টা ৭ মিনিটে মেক্সিকোর প্রশান্ত মহাসাগরীয় উপকূলে প্রথম সূর্যগ্রহণ দেখা যাবে। 

Dummy Ad 1

আফগানিস্তান সীমান্তে পাকিস্তানের হামলা, নিহত ২৯

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশিত: ২৯ জুন, ২০২৬

আফগানিস্তান সীমান্তে পাকিস্তানের হামলা, নিহত ২৯

আফগানিস্তান সীমান্তে বড় ধরনের সামরিক অভিযান চালিয়েছে পাকিস্তান। দেশটির নিরাপত্তা বাহিনীর স্থল ও বিমান হামলায় অন্তত ২৯ জন সশস্ত্র যোদ্ধা নিহত হয়েছেন। সম্প্রতি পাকিস্তানে একের পর এক প্রাণঘাতী হামলার জবাবে এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন কর্মকর্তারা।

পাকিস্তানের তথ্যমন্ত্রী আতাউল্লাহ তারার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এই অভিযানের কথা নিশ্চিত করেছেন। তিনি জানান, দেশের বিভিন্ন স্থানে সশস্ত্র গোষ্ঠীর হামলার জবাবে এই অভিযান চালানো হয়েছে।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে (সাবেক টুইটার) দেওয়া এক পোস্টে আতাউল্লাহ তারার বলেন, নিখুঁত নিশানায় চালানো এই হামলায় পূর্ব আফগানিস্তানের পাক্তিয়া, পাক্তিকা ও কুনার প্রদেশের তিনটি আস্তানা ধ্বংস করা হয়েছে। তবে এই হামলার বিষয়ে আফগানিস্তানের পক্ষ থেকে তাৎক্ষণিক কোনো প্রতিক্রিয়া জানা যায়নি।

তথ্যমন্ত্রী তারার জানান, আফগান সীমান্ত এলাকায় চালানো পাকিস্তানের এই সর্বশেষ অভিযানে পাকিস্তানি তালেবানের (টিটিপি) লুকিয়ে থাকার জায়গা ও নিরাপদ আশ্রয়স্থলগুলোকে লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছে।

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে পাকিস্তানে পুলিশ ও নিরাপত্তা বাহিনীকে লক্ষ্য করে হামলা আশঙ্কাজনকভাবে বেড়েছে। এসব সহিংসতার জন্য পাকিস্তানি তালেবান বা টিটিপি এবং তাদের সহযোগী সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোকে দায়ী করে আসছে ইসলামাবাদ।

টিটিপি আফগান তালেবানের চেয়ে একটি আলাদা সশস্ত্র গোষ্ঠী হলেও তারা পরস্পর মিত্র। ২০২১ সালে প্রতিবেশী আফগানিস্তানে আফগান তালেবান ফের ক্ষমতায় আসার পর থেকে এ অঞ্চলে সমীকরণ অনেকটাই বদলে গেছে। রোববারের এই আন্তঃসীমান্ত বিমান ও স্থল হামলার ফলে ইসলামাবাদ এবং কাবুলের মধ্যকার উত্তেজনা আরও বাড়বে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

করাচি হামলার পর এই পদক্ষেপ

পাকিস্তানের আধাসামরিক বাহিনী রেঞ্জার্সের আঞ্চলিক সদর দপ্তরে অস্ত্র ও বিস্ফোরক নিয়ে একদল যোদ্ধা হামলা চালানোর ঠিক পরদিনই এই অভিযান চালানো হলো। করাচির ওই হামলায় তিন পাকিস্তানি সেনা নিহত হন। পরে নিরাপত্তা বাহিনী পাল্টা প্রতিরোধ গড়ে তুলে তিন হামলাকারীকে হত্যা করে এবং একজনকে আহত অবস্থায় গ্রেপ্তার করে। সামরিক বাহিনীর তথ্যমতে, গ্রেফতার হওয়া ওই ব্যক্তি একজন আফগান নাগরিক।

শনিবার রাতে দেওয়া এক বিবৃতিতে জামাত-উল-আহরার নামের একটি গোষ্ঠী করাচি হামলার দায় স্বীকার করেছে। গোষ্ঠীটি পাকিস্তানি তালেবান বা টিটিপির একটি বিচ্ছিন্ন অংশ হিসেবে পরিচিত।

উত্তেজনা বাড়ছে দুই দেশে

গত তিন সপ্তাহের কম সময়ের মধ্যে আফগানিস্তানে এটি পাকিস্তানের দ্বিতীয় দফা বিমান হামলা। এর আগে গত ফেব্রুয়ারি মাস থেকে দুই দেশের মধ্যে দফায় দফায় সামরিক সংঘাত চলছে। আফগান ভূখণ্ডে পাকিস্তানের বিমান হামলার জবাবে আফগানিস্তানও পাল্টা হামলা চালিয়েছিল। এরপর থেকে সীমান্ত সংঘাত ও লড়াইয়ে এরই মধ্যে শত শত মানুষের মৃত্যু হয়েছে।

পাকিস্তান বরাবরই অভিযোগ করে আসছে, আফগান তালেবান সরকার তাদের দেশে টিটিপিসহ বিভিন্ন সশস্ত্র যোদ্ধাদের আশ্রয় দিচ্ছে। আর এই যোদ্ধারাই পাকিস্তানের ভেতরে ঢুকে প্রাণঘাতী হামলা চালাচ্ছে। তবে কাবুলের পক্ষ থেকে বরাবরই এই অভিযোগ অস্বীকার করা হয়েছে।


লেবানন-সিরিয়া-গাজা থেকে সেনা প্রত্যাহার করবে না ইসরায়েল

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশিত: ১৫ জুন, ২০২৬

লেবানন-সিরিয়া-গাজা থেকে সেনা প্রত্যাহার করবে না ইসরায়েল

ইসরায়েলের প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইসরায়েল কাৎজ বলেছেন, ইসরায়েলি বাহিনী লেবানন, সিরিয়া ও গাজায় অনির্দিষ্টকালের জন্য থাকবে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান লেবাননসহ মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ শেষ করতে একটি চুক্তিতে সম্মত হওয়ার কয়েক ঘণ্টা পর সোমবার এমন মন্তব্য করেছেন তিনি।

ইসরায়েল কাৎজ এক বিবৃতিতে বলেন, প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু এবং আমি একটি সুস্পষ্ট নীতি অনুসরণ করছি, যার অধীনে জিহাদি শক্তির হাত থেকে সীমান্ত এবং সেখানকার ইসরায়েলি জনবসতিগুলোকে রক্ষা করার জন্য ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা বাহিনী (আইডিএফ) লেবানন, সিরিয়া ও গাজার নিরাপত্তা অঞ্চলগুলোতে অনির্দিষ্টকালের জন্য অবস্থান করবে। এই বিবৃতিতে যুক্তরাষ্ট্র-ইরান চুক্তির কোনো উল্লেখ করা হয়নি।

এলাকাটি স্থানীয় বাসিন্দামুক্ত করা হবে এবং মাটির উপরে ও নিচে থাকা সব সন্ত্রাসী অবকাঠামো—যার মধ্যে সম্মুখসারির গ্রামগুলোর সেইসব বাড়িঘরও রয়েছে যেগুলো সন্ত্রাসী ঘাঁটি হিসেবে ব্যবহৃত হতো সেগুলো ধ্বংস করে দেওয়া হবে।

ইসরায়েল কাৎজ বলেন, এলাকা দখলে রাখা এবং নিরাপত্তা অঞ্চল বজায় রাখা আইডিএফের অন্যতম শ্রেষ্ঠ অর্জন...। তাই বিদ্যমান এবং ভবিষ্যতে আসতে পারে এমন সব চাপ সত্ত্বেও আমরা লেবানন থেকে আইডিএফ সদস্যদের প্রত্যাহারের বিরোধিতা করছি। তিনি আরও বলেন, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পকে নেতানিয়াহু এ বিষয়ে অবহিত করেছেন।

ইরানকেও সতর্ক করে তিনি বলেছেন, লেবাননে তাদের অভিযানের জবাবে যদি ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইসরায়েলের ওপর হামলা করে, তবে ইসরায়েল ‌‘পূর্ণ শক্তি’ দিয়ে তার পাল্টা জবাব দেবে।

ইসরায়েল কাৎজ বলেন, ইসরায়েলের সর্বোচ্চ নিরাপত্তা স্বার্থ এবং আমাদের নাগরিকদের সুরক্ষার বিষয়ে আমরা কোনো আপস করব না এবং আমরা নিরাপত্তা অঞ্চলগুলো থেকে সরে আসব না।লেবাননের ঘটনা নিয়ে যদি ইরান ইসরায়েলের ওপর হামলা করে, তবে আমরা পূর্ণ শক্তি দিয়ে তার ওপর আঘাত হানব এবং আমাদের সক্ষমতার পার্থক্য স্পষ্টভাবে দেখিয়ে দেব।



ঘুমন্ত ছোট্ট শিশুকেও ছাড়েনি ইসরায়েল, ৪ সন্তান হারিয়ে নিঃস্ব মা

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশিত: ০২ আগস্ট, ২০২৬

ঘুমন্ত ছোট্ট শিশুকেও ছাড়েনি ইসরায়েল, ৪ সন্তান হারিয়ে নিঃস্ব মা

খোলা জানালার পাশে একটি ছোট কক্ষে শুয়ে কোনো কম্বল ছাড়াই ঘুমাচ্ছিল ১৫ মাস বয়সী শিশু জাইদ নোফাল। গাজার প্রচণ্ড তাপদাহ থেকে বাঁচতেই তাকে জানালার পাশে রাখা হয়েছিল। কিন্তু রাত ৩টার দিকে আল-বুরেইজ শরণার্থী শিবিরে তাদের বাড়িতে ইসরায়েলি বিমান হামলা পর ধ্বংসস্তূপের নিচে পাওয়া যায় ছোট্ট জাইদের নিথর দেহ।

হামলার স্থান থেকে মাত্র কয়েক মিটার দূরে গভীর স্তব্ধতায় স্তম্ভিত হয়ে দাঁড়িয়েছিলেন তার ৩৮ বছর বয়সী ফিলিস্তিনি মা ফাতিমা নোফাল। রক্ত ও ধুলাবালিতে মাখামাখি আর চারপাশে প্রতিবেশীদের তীব্র চিৎকারের মাঝে দাঁড়িয়ে এক পরম নৃশংসতার মুখোমুখি হন তিনি। ২০২৩ সালে ইসরায়েলি হামলায় তার তিন ছেলে নিহত হয়েছিল, আর এবার তিনি হারালেন তার চতুর্থ সন্তানকে।

২০২৫ সালের অক্টোবরে যুদ্ধবিরতি ঘোষণার পর ফাতিমাদের বাড়িটি আংশিক পুনর্নির্মাণ করা হয়েছিল, যা আবারও গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়। এ বিষয়ে মিডল ইস্ট আই-কে ফাতিমা নোফাল বলেন, আমি এখনো মেনে নিতে পারছি না কী ঘটে গেলো। আমি গভীর এক ঘোর ও স্তব্ধতার মধ্যে আছি।

ঘটনার স্মৃতিচারণ করে তিনি বলেন, আমার শুধু মনে আছে যে হামলার ঠিক কয়েক মিনিট আগে ঘুম ভেঙে যায়। তীব্র গরমের কারণে আমি অন্য জায়গায় সরে যাই ও আমার ছোট জাইদকে জানালার পাশে রেখে আসি যাতে বাতাসে সে একটু শান্তিতে ঘুমাতে পারে।

হামলায় নিজে আহত হওয়া সত্ত্বেও ফাতিমা সেখান থেকে সরতে রাজি হননি। তিনি প্রতিবেশীদের ডেকে তার সন্তানকে খোঁজার আকুতি জানান। তিনি জানান, ঘরটি ধ্বংসস্তূপে ভরে গিয়েছিল ও প্রতিবেশীরা তাকে খুঁজতে ইট-পাথর সরাতে শুরু করেন। অবশেষে ধ্বংসস্তূপ থেকে বের করে একটি পাতলা চাদরে মুড়িয়ে জাইদকে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়।

২০২৩ সালে একসঙ্গে হারিয়েছিলেন ৩ সন্তানকে

জাইদের এই নির্মম মৃত্যু ফাতিমার হৃদয়ে ২০২৩ সালের ১৩ অক্টোবরের সেই ভয়াল স্মৃতিকে আবারও জাগিয়ে তুলেছে, যখন এক ইসরায়েলি বিমান হামলায় তার তিন সন্তান প্রাণ হারিয়েছিল। সেদিন কেবল তিনি ও তার দুই মেয়ে বেঁচে যেতে সক্ষম হন।

যুদ্ধ শুরুর সময় সীমান্ত এলাকা থেকে বাঁচার আশায় ফাতিমা ও তার পরিবার আল-বুরেইজ শরণার্থী শিবির থেকে উপকূলীয় শহর আল-জাওয়াইদার আল-সাওয়ারহা এলাকায় পালিয়ে গিয়েছিলেন।

ফাতিমা বলেন, পরিস্থিতির ভয়াবহতা অনুধাবন করে আমরা পালিয়েছিলাম। ভেবেছিলাম সীমান্তের চেয়ে ওই এলাকা নিরাপদ হবে। কিন্তু আমরা স্বপ্নেও ভাবিনি যে নিরাপত্তার আশায় যেখানে যাচ্ছি, সেখানেই আমার চোখের সামনে আমার তিন ছেলে ও শ্বশুরবাড়ির অধিকাংশ মানুষ প্রাণ হারাবে।

সেই ভয়াবহ হামলায় তার জ্যেষ্ঠ পুত্র ১৬ বছরের আমিন, ১১ বছরের হামজা ও মাত্র ২২ দিন বয়সী শিশু সন্তান আহমেদ নিহত হয়। এতে ফাতিমা ও তার দুই মেয়ে আহত হন এবং আশ্রয়স্থল হারিয়ে বারবার বাস্তুচ্যুত হতে বাধ্য হন।

এক ক্ষুদ্র অলৌকিক আলো

২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে শুরু হওয়া যুদ্ধের পর গাজার প্রায় পুরো জনসংখ্যার মতো ফাতিমাকেও বারবার বাস্তুচ্যুতির ভোগান্তি ও অনিশ্চয়তার মধ্যে দিন কাটাতে হয়েছে। তিন সন্তানকে হারানোর ১০ মাস পর তিনি যখন জানতে পারেন যে তিনি আবারও অন্তঃসত্ত্বা এবং তাঁর গর্ভে একটি ছেলে সন্তান রয়েছে, তখন তাঁর জীবনে যেন আশার আলো ফুটে ওঠে।

২০২৫ সালের ১৬ এপ্রিল যুদ্ধের ভয়াবহতার মাঝেই জন্ম নেয় জাইদ। ফাতিমার বিশ্বাস ছিল, হারিয়ে যাওয়া সন্তানদের খালি স্থান পূরণ করতেই তার কোল আলো করে জাইদের আগমন ঘটেছে।

ফাতিমা স্মৃতি স্মরণ করে বলেন, যুদ্ধের মধ্যে জাইদের জন্মই ছিল আমাদের জীবনের সবচেয়ে বড় আনন্দঘন মুহূর্ত। দীর্ঘদিনের যন্ত্রণা ও চোখের জলের পর একটি ক্ষুদ্র অলৌকিক আলো হিসেবে সে আমাদের জীবনকে আলোকিত করতে এসেছিল, পরিবারের সবাই তাকে নিয়ে মেতেছিল।

স্বজনেরা জাইদের নাম তার পরলোকগত ভাইদের কারও নামে রাখার পরামর্শ দিলেও ফাতিমা রাজি হননি। তিনি চাননি জাইদ অন্য কারও ছায়ায় বাড়ুক, বরং চেয়েছেন তার নিজের নাম ও নিজস্ব ভাগ্য থাকুক।

ধীরে ধীরে জাইদ পুরো পরিবারের নয়নের মণি হয়ে ওঠে। বিশেষ করে তার বোনেরা তাকে খুব বেশি ভালোবাসতো। ফাতিমা জানান, টিকা বা পরীক্ষা-নিরীক্ষার জন্য তাকে ক্লিনিকে নিয়ে গেলে বোনেরা সিঁড়িতে অপেক্ষা করতো; কয়েক ঘণ্টার জন্যও তারা জাইদকে ছেড়ে থাকতে পারতো না।

পায়ের পোড়া ক্ষত নিয়ে কথা বলা ফাতিমা জানান, হামলায় তার বড় মেয়ে বারা সামান্য আঘাত পেলেও ছোট মেয়ে লিনা মাথায় প্রচণ্ড আঘাত পেয়েছে।

তিনি বলেন, লিনা এখনো হাসপাতালে। যখন আমি তার কাছে গেলাম, সে প্রথমেই জাইদের কথা জিজ্ঞেস করেছিল। কিন্তু আহত মেয়েকে সত্য বলার সাহস আমার হয়নি। আমি তাকে বলেছি জাইদ ভালো আছে ও তার জন্য অপেক্ষা করছে। হাসপাতাল থেকে ছাড় পাওয়ার পর তাকে কীভাবে সত্য বলব, তা আমি জানি না।

জাইদ কখনোই স্বাভাবিক শৈশব পায়নি বলে আক্ষেপ করেন তার মা। তিনি বলেন, যেদিন সে মারা গেলো, সেদিন বিকেলে সে খুব ছটফট করছিল ও বাইরে যেতে চাইছিল। আমি তার বোনেদের বলেছিলাম, তাকে একটু ঘুরিয়ে আনতে পারলে কতই না ভালো হতো, কিন্তু শিশুদের খেলার জন্য তো কোনো জায়গা অবশিষ্ট নেই।

‘সে সারা জীবন ঘরের ভেতরেই কাটিয়েছে। এমনকি, ইসরায়েলি বিমান হামলায় তার চাচাতো ভাই-বোনেরা নিহত হওয়ায় একসঙ্গে খেলার মতোও কেউ ছিল না।’

শিশুদের ‘উদ্দেশ্যপ্রণোদিত’ নিশানা

দুই বছর ধরে চলা গাজা গণহত্যার পর গত বছর একটি যুদ্ধবিরতি চুক্তি হলেও ইসরায়েল প্রায় প্রতিদিনই উপত্যকাটিতে বোমা হামলা চালিয়ে যাচ্ছে। চুক্তিটি স্বাক্ষরের পর থেকে গত ১০ মাসে ইসরায়েলি হামলায় অন্তত ১২০০ জন নিহত হয়েছেন। সব মিলিয়ে ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে এ পর্যন্ত ইসরায়েলি বাহিনীর হাতে ৭৩ হাজারেরও বেশি ফিলিস্তিনি প্রাণ হারিয়েছেন।

সংঘাতের এই পর্বতসম পরিসংখ্যানে নিষ্পাপ শিশুদের জীবনও রক্ষা পায়নি। জাতিসংঘের শিশু বিষয়ক সংস্থা (ইউনিসেফ) জুনে জানিয়েছে, যুদ্ধবিরতি শুরুর পর থেকে গাজায় অন্তত ২৬০ জন শিশু নিহত হয়েছে।

ইউনিসেফের মুখপাত্র জেমস এল্ডার একে ‘যুদ্ধবিরতির এক নিষ্ঠুর ও প্রাণঘাতী অলীক মায়াজাল’ হিসেবে আখ্যা দিয়ে বলেন, গাজায় গড়ে প্রতিদিন একটি করে শিশু মারা যাচ্ছে।

নিজের সন্তানদের চোখের সামনে প্রাণ হারাতে দেখে ফাতিমা বিশ্বাস করেন, ফিলিস্তিনি বেসামরিক নাগরিক, বিশেষ করে নারী ও শিশুদেরকে উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবেই নিশানা বানাচ্ছে ইসরায়েল। তিনি ক্ষোভের সঙ্গে বলেন, যুদ্ধ শুরুর পর থেকে আমরা যে হতাহতের দৃশ্য দেখছি, তার বড় অংশই নারী ও শিশু। ইসরায়েল আমাদের হত্যা করতে বদ্ধপরিকর ও এর জন্য তাদের কোনো অজুহাতের প্রয়োজন হয় না।

যেদিন আল-বুরেইজ শরণার্থী শিবিরে জাইদকে হত্যা করা হয়, ঠিক একই দিনে আল-মাওয়াসিতে মামার তাঁবুতে ইসরায়েলি হামলায় রতিল আল-আবদাল্লাহ নামে নয় বছর বয়সী এক শিশুও প্রাণ হারায়। যুদ্ধের ভয়াবহতা থেকে কিছুটা স্বস্তি পেতে দুদিন আগে মা ও ভাইবোনদের সাথে মামার বাড়িতে বেড়াতে এসেছিল রতিল।

তার বাবা আবদুল্লাহ আল-আবদাল্লাহ মেয়ের নিথর দেহ জড়িয়ে ধরে আকুতি করে জানতে চান- এমন ভাগ্যের জন্য তাঁর এই নিষ্পাপ শিশুটি কী অপরাধ করেছিল? সেই করুণ ভিডিওটি সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। আজ গাজাজুড়ে প্রতিটি পরিবারের মনে এই একই প্রশ্ন প্রতিধ্বনিত হচ্ছে।

জাতিসংঘের একটি স্বাধীন তদন্ত কমিশন প্রমান পেয়েছে যে, ইসরায়েলি বাহিনী ফিলিস্তিনি শিশুদের ওপর জেনেশুনে হামলা চালাচ্ছে, যা তাঁদের চালানো গণহত্যারই অংশ।

তবে এসব প্রতিবেদন বা পরিসংখ্যান দিয়ে ফাতিমার হারানো জাইদ কিংবা তার আগে মারা যাওয়া তিন সন্তানকে আর কখনোই ফেরানো সম্ভব নয়। হাসপাতালে আহত মেয়ের পাশে বসে ফাতিমা এখন নতুন এক লড়াইয়ের মুখোমুখি—মাথা গোঁজার নতুন ঠাঁই খোঁজা এবং মেয়েকে এই চরম সত্যিটা জানানো যে, তার আদরের ছোট ভাইটি আর কখনোই ফিরবে না।

ফাতিমা আর্তনাদ করে বলেন, আমার বুকের ভেতর তুষের আগুন জ্বলছে, আর আমি জানি না কে এই আগুন নেভাবে।