শেয়ার বাজার

‘সাহেব সিন্ডিকেট’ ছাড়া দুবলার চরে শুঁটকি বিক্রি মানা

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশিত: সোমবার, ২৬ জানুয়ারী ২০২৬

‘সাহেব সিন্ডিকেট’ ছাড়া দুবলার চরে শুঁটকি বিক্রি মানা

সুন্দরবনের দক্ষিণাংশে বঙ্গোপসাগরের কোলঘেঁষা একটি অনন্য দ্বীপের নাম দুবলার চর। বাগেরহাটের শরণখোলার প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ও জীববৈচিত্র্যে ঘেরা দ্বীপটি পর্যটকদের জন্য অত্যন্ত আকর্ষণীয়। এ সুযোগ নিয়ে শুঁটকি মাছ কেনাবেচা ঘিরে সেখানে গড়ে উঠেছে ‘সাহেব সিন্ডিকেট’। তারা ছাড়া অন্য কেউ শুঁটকি বিক্রি করতে পারেন না। পর্যটকদের পকেট কেটে তারা হাতিয়ে নিচ্ছে লাখ লাখ টাকা।

সম্প্রতি সরেজমিনে দুবলার চর গিয়ে এ সিন্ডিকেটের সন্ধান পাওয়া যায়। জেলেদের অভিযোগ ও ফিশারম্যান গ্রুপের সভাপতির বক্তব্য পর্যালোচনা করে দেখা যায়, প্রতি কেজি লইট্টা ও ছুরি শুঁটকিতে ২-৪শ টাকা বেশি নেওয়া হচ্ছে। সে হিসেবে সিন্ডিকেট কারসাজির মাধ্যমে চলতি মৌসুমে কয়েক কোটি টাকা ভাগাভাগির সুযোগ তৈরি করা হয়েছে।

শুঁটকি মাছ কেনাবেচা ঘিরে সেখানে গড়ে উঠেছে ‘সাহেব সিন্ডিকেট’। তারা ছাড়া অন্য কেউ শুঁটকি বিক্রি করতে পারেন না। পর্যটকদের পকেট কেটে তারা হাতিয়ে নিচ্ছেন লাখ লাখ টাকা।-দুবলা নিউমার্কেট ফিশারম্যান গ্রুপের সভাপতি কামাল আহম্মদ

পর্যটক ও স্থানীয় জেলেদের অভিযোগ, বনবিভাগের সহযোগিতায় ‘সাহেব’ হিসেবে পরিচিত কয়েকজন প্রভাবশালী মধ্যস্বত্বভোগী মিলে এ সিন্ডিকেট গড়ে তুলেছে। বিভিন্ন ট্রান্সপোর্ট এজেন্সি নামে এসব সিন্ডিকেট সদস্য পর্যটকদের কাছে কয়েকগুণ বেশি দামে শুঁটকি বিক্রি করছেন। একদিকে স্থানীয় সাধারণ জেলেরা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন, অন্যদিকে ঠকছেন পর্যটকরা। এতে সুন্দরবন ঘিরে গড়ে ওঠা হাজার কোটি টাকার পর্যটন শিল্পে নেতিবাচক প্রভাব পড়বে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

শুঁটকি উৎপাদনের জন্য দুবলার চর দেশের অন্যতম বড় কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত। নভেম্বর থেকে মার্চ সময়টিতে মূলত শুঁটকি উৎপাদন ও বেচাকেনা চলে। প্রতি বছর শীত মৌসুমের এ সময়টিতে দেশের বিভিন্ন উপকূলীয় অঞ্চল থেকে হাজারো জেলে দুবলার চরে গিয়ে অস্থায়ী বসতি গড়ে তোলেন। সাগর থেকে ধরা লইট্টা, ছুরি, ফাইস্যা, পোয়া, টেংরা, তপসি, চাপিলা, রূপচাঁদা, চিংড়িসহ সামুদ্রিক বিভিন্ন প্রজাতির মাছ শুকিয়ে শুঁটকি তৈরি করেন জেলেরা। বাঁশের মাচায় খোলা রোদে মাছ শুকিয়ে প্রস্তুত করা এসব শুঁটকি দেশের বিভিন্ন পাইকারি বাজারে সরবরাহ করা হয়।

গত ১৩ জানুয়ারি সরেজমিনে দেখা যায়, দুবলার চরের জেলেপল্লিতে জেলেদের শত শত অস্থায়ী ঘর। সামনে মাছ শুকানোর মাচা। তবে সময়টিতে মাছের জোগান না থাকায় মাচাগুলোতে তেমন মাছ ছিল না। জেলেপল্লির সামনে সৈকত লাগোয়া চরে চারটি অস্থায়ী দোকানে শুঁটকি বিক্রি হচ্ছে।

এখানে আগে থেকেই আটটি ট্রান্সপোর্ট ছিল। এবছর থেকে পর্যটকদের মধ্যে ট্রান্সপোর্টগুলোর মাধ্যমে শুঁটকি বিক্রি করা হচ্ছে। ঝামেলা এড়াতে বনবিভাগ থেকে এর মধ্যে চারটি ট্রান্সপোর্টকে শুঁটকি বিক্রির দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। প্রতি কেজি শুঁটকিতে সাড়ে ১১ টাকা রাজস্ব আসে।- বনবিভাগের দুবলা জেলেপল্লি টহল ফাঁড়ির ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা ফরেস্ট রেঞ্জার মিলটন রায়

সূর্য ততক্ষণে অস্ত গেছে। পর্যটকদের জাহাজে ফেরার তোড়জোড়। শেষ মুহূর্তে দোকানগুলোতে ভিড় করেন আগ্রহী পর্যটকরা। দোকানি যে দামই চাইছেন, তড়িঘড়ি করে সে দামেই শুঁটকি কিনছেন তারা। অনেক পর্যটক শুঁটকির দাম সম্পর্কে অবগত না থাকলেও যারা নিয়মিত শুঁটকি খান, দুবলার চরে শুঁটকির দাম শুনে তারা হতবাক। খুলনা কিংবা চট্টগ্রামে খুচরা দোকানে যে দামে শুঁটকি বিক্রি হয়, একই শুঁটকি দুবলার চরের ওই চার দোকানে বিক্রি হচ্ছে অনেক বেশি দামে।

ঠকছেন জেলেরা

দুবলার জেলেপল্লির বেশ কয়েকজন জেলের সঙ্গে কথা হয় বার্তাবেলা নিউজের। জেলেদের অভিযোগ, তারা উৎপাদন পর্যায়ে ন্যায্যমূল্য পান না। কিন্তু সিন্ডিকেট করে পর্যটকদের কাছে সেই শুঁটকি অতিরিক্ত দামে বিক্রি করা হচ্ছে। পর্যটকদের কাছ থেকে হাতিয়ে নেওয়া অতিরিক্ত টাকা ভাগবাটোয়ারা হয় সিন্ডিকেট সদস্য ও বনবিভাগের মধ্যে।

সাতক্ষীরার তালা থানা এলাকার বাসিন্দা প্রশান্ত বিশ্বাস শুঁটকি মৌসুমে পাঁচ মাসের জন্য অন্য জেলেদের মতো দুবলার চরে যান। বনবিভাগ থেকে অনুমতি নেওয়া লোকদের কাছ থেকে ঘর ভাড়া নিয়ে শুঁটকি তৈরি করেন। আগের বছরগুলোতে শুকানো শুঁটকি দুবলার চরে বেড়াতে আসা পর্যটকদের কাছেও বিক্রি করতে পারতেন। তাতে কিছুটা লাভবান হতেন মাছ শুকানোয় জড়িত জেলেরা। পর্যটকরাও বাজারের চেয়ে অপেক্ষাকৃত কম দামে শুঁটকি কিনতে পারতেন। তবে চলতি মৌসুম থেকে সেই সুযোগ পাচ্ছেন না পর্যটক ও সাধারণ জেলেরা।

প্রশান্ত বিশ্বাস বার্তাবেলা নিউজকে বলেন, ‘আমরা এখন পর্যটকদের কাছে সরাসরি মাছ (শুঁটকি) বিক্রি করতে পারি না। এবছর সাহেবদের দোকানে শুঁটকি বেচাকেনা করতে হবে। দুবলায় চার-পাঁচজন সাহেব আছেন। কামাল সাহেব, পিন্টু সাহেব, হক সাহেব আছে। তাদের দোকান ছাড়া পর্যটকরা শুঁটকি কিনতে পারবে না। আমরাও পর্যটকদের কাছে সরাসরি শুঁটকি বিক্রি করতে পারবো না।’

তারা অতিরিক্ত দাম নিলেও নিতে পারেন। কিন্তু রাজস্বের বাইরে আমরা কিছু দেখি না। যে দোকানগুলো বসেছে, তারাই (ট্রান্সপোর্ট মালিক) আলাপ করে সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। এখন যেহেতু একচেটিয়া ব্যবসার অভিযোগ আসছে, সেখানে আরও কিছু দোকান বসানোর কথা বলবো।- বাগেরহাট জেলার সুন্দরবন পূর্ব বনবিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা মো. রেজাউল করিম চৌধুরী

তৈরি শুঁটকি কোথায় পাঠানো হয় জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘সৈয়দপুর ও চট্টগ্রামে শুঁটকি পাঠাই। ছোট সাইজের ছুরি শুঁটকি ৪শ, ৫শ, ৬শ টাকা, মাঝারি ৮শ থেকে এক হাজার টাকা বিক্রি হয়। এখানকার সাহেবদের দোকানগুলোতে অধিক দামে বিক্রি হয়। এতে সাধারণ জেলেরা লাভবান হতে পারছেন না।’

জেলে মাধব দাশ বলেন, ‘দুবলার চর থেকে শুধু পর্যটকেরা শুঁটকি কেনেন, তা কিন্তু নয়। এখান থেকে শুঁটকি চট্টগ্রাম, সৈয়দপুরসহ নানান জেলায় পাইকারি পাঠানো হয়। চাহিদার ওপর ভিত্তি করে মাছের দাম বাড়ে কমে। নদীতে মাছ কম পাইলে দাম বেশি হয়। বেশি পাইলে দাম কম হয়।’

তিনি বলেন, ‘এ বছর থেকে জেলেদের চাতাল থেকে সরাসরি পর্যটকদের কাছে শুঁটকি বিক্রি নিষেধ হয়ে গেছে। আমরা যারা মাছ শুকাই তারা বিক্রি করতে পারব না। এখন পর্যটকদের শুঁটকি বিক্রির জন্য আলাদা দোকান বরাদ্দ হয়েছে। নির্ধারিত ওই দোকানগুলো থেকে পর্যটকদের শুঁটকি কিনতে হবে।’

জেলে মিলন বিশ্বাস বলেন, ‘এখানকার চারটি দোকানে জেলেদের কাছ থেকে মণ ২০ হাজার টাকায় কিনে নিয়ে ৩৫-৪০ হাজার টাকায় বিক্রি করছে। বড় ছুরি মাছ আমাদের কাছ থেকে নিলে ৭শ ৮শ, ৯শ টাকা, মাঝারি ছুরি ৬শ-৭শ টাকা। এখন সিন্ডিকেট হয়ে গেছে। ছোট-মাঝারি ছুরি বিক্রি করছে ৮শ থেকে ১২শ টাকায়।’

আরেক জেলে পিযুষ বিশ্বাস জাগো নিউজকে বলেন, ‘সাতক্ষীরা থেকে এসেছি মাছ ধরতে। এবার আমরা ১২ লাখ টাকা খরচ করে এখানে পৌঁছেছি। এখানে আসার তিনদিন পর জেনেছি এখানে সিন্ডিকেট হয়েছে। সিন্ডিকেটের লোকজন বাসা তৈরি করে স্পেশালভাবে মাছ বিক্রি করছে। আগে পর্যটকদের কাছে আমরা মাছ বিক্রি করতে পারতাম। এখন বিক্রি করলে ২০ হাজার টাকা জরিমানা।’

তিনি বলেন, ‘এখন সাহেবরা (প্রভাবশালীরা সাহেব হিসেবে পরিচিত) মাছ বিক্রি করেন। উচ্চ লেবেলের সাহেবরা মিলে সিন্ডিকেট করেছেন। টোকন সাহেব, কামাল সাহেব, সব সাহেবরা মিলে সিন্ডিকেট করেছেন। গত বছর যে দামে পর্যটকদের কাছে মাছ বিক্রি করেছি, এবছর বিক্রি করতে পারছি না। আমরা এতে ক্ষতিগ্রস্ত। পর্যটকরা আগের বছর ৪শ-৫শ টাকায় যে মাছ কিনেছে, এবছর কিনতে হচ্ছে এক হাজার টাকায়। তারাও (পর্যটকরা) মন খারাপ করে ফিরে যাচ্ছে।’

ছোট একটি গাগড়া টেংরা শুঁটকি দেখিয়ে পিযুষ বলেন, ‘এই মাছ কেজি একশ টাকায় কিনে দোকানগুলোতে ৪শ টাকায় বিক্রি করছে। তারা সিন্ডিকেট করে বিক্রি করছে। একই মাছ আমরা দেড়শ-দুইশ টাকায় বিক্রি করতাম।’

মৌসুমে ২ লাখ পর্যটক ভ্রমণ করেন সুন্দরবন

শীত মৌসুমে সুন্দরবনে ট্যুর পরিচালনাকারীদের সংগঠন ট্যুর অপারেটর অ্যাসোসিয়েশন অব সুন্দরবনের (টোয়াস) তথ্যমতে, সুন্দরবনে পর্যটকদের সেবা দেয় ৮০টির মতো জাহাজ। নভেম্বর থেকে মে মাস পর্যন্ত তারা ট্যুর পরিচালনা করে। বনবিভাগের নিয়ম অনুযায়ী একটি জাহাজ এক ট্রিপে ৭৫ জনের বেশি পর্যটক নিতে পারেন না। চাহিদা অনুসারে সপ্তাহে দুটি ট্যুর পরিচালনা করে জাহাজগুলো। দুই লাখের মতো পর্যটক প্রতি মৌসুমে সুন্দরবন ভ্রমণ করেন। এর মধ্যে কমবেশি একলাখ পর্যটক দুবলার চর ভ্রমণে যান।

সুন্দরবনে বড় ট্যুর পরিচালনাকারী হলিডেজ শিপিং লাইনস। তাদের দুটি উন্নত ক্রুজ রয়েছে। প্রতিষ্ঠানটির মালিক আবুল ফয়সাল মো. সায়েম বাবু টোয়াসের কোষাধ্যক্ষ হিসেবেও দায়িত্ব পালন করছেন। দুবলার চরে শুঁটকি সিন্ডিকেটের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি জাগো নিউজকে বলেন, ‘সুন্দরবন ট্যুরে ৭০টি জাহাজ রয়েছে। প্রতি সিজনে কোনো কোনো জাহাজ ৪০টির মতো ট্যুর করে। প্রতি ট্যুরে ৭০ জনের মতো পর্যটক থাকে। সুন্দরবনে গেলে পর্যটকেরা দুবলার চরে যান।’

তিনি বলেন, ‘দুবলায় আগে যে লইট্টা মাছ ৩শ টাকায় বিক্রি হতো, এবার সেটা সাড়ে ৭শ-৮শ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে দুবলায় যাওয়া পর্যটকরা অতিরিক্ত দামে শুঁটকি কিনে প্রতারিত হচ্ছে। এখন দেশে নির্বাচনের হাওয়া চলছে। নির্বাচনের পরপরই আমরা বিষয়টি বনবিভাগসহ সংশ্লিষ্ট দপ্তরে সিন্ডিকেট বন্ধের দাবি জানাবো।’

চার দোকান ছাড়া বিক্রি করতে পারে না শুঁটকি

চলতি মৌসুমে দুবলার চরে চারটি দোকানে পর্যটকদের কাছে শুঁটকি বিক্রি হচ্ছে। সেগুলো হলো- সাগর ট্রান্সপোর্ট, মেসার্স সুন্দরবন ট্রান্সপোর্ট এজেন্সি, সুন্দরবন সাউথ জোন ট্রান্সপোর্ট ও মেসার্স নিউ রামপাল ট্রান্সপোর্ট এজেন্সি। জাগো নিউজের হাতে আসা সাগর ট্রান্সপোর্টের একটি রসিদে লেখা রয়েছে- ‘দুবলার চরে রসিদ ব্যতীত শুঁটকি ক্রয় আইনগত দণ্ডনীয় অপরাধ।’

সাড়ে ১১ টাকা রাজস্বের জন্য শুঁটকির দামে অস্থিরতা

দুবলা নিউ মার্কেট ফিশারম্যান গ্রুপের সভাপতি কামাল আহম্মদ। রসিদে ‘প্রোপ্রাইটর বীর মুক্তিযোদ্ধা কামাল আহম্মদ’ লেখা রয়েছে। কামাল আহম্মদের ভাষ্য- দুবলায় তার নিজের তিনটিসহ ছয়টি পরিবহন প্রতিষ্ঠান রয়েছে। সাগর ট্রান্সপোর্ট ও মেসার্স সুন্দরবন ট্রান্সপোর্ট এজেন্সি ও বিলাস ট্রান্সপোর্টের মালিক তিনি।

দোকানগুলোতে কোরাল, রূপচাঁদা শুঁটকি প্রতি কেজি ৪ হাজার টাকা, লইট্টা ৮শ থেকে ১১শ টাকা, ছোট ছুরি শুঁটকি ১ হাজার থেকে ১৪শ টাকা, বড় চিংড়ি ১৩শ টাকা, ছোট চিংড়ি পোনা ৩০০-৩৫০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। তবে বেশিরভাগ পর্যটক লইট্টা ও ছুরি শুঁটকিই কেনেন।

কামাল আহম্মদ বার্তাবেলা নিউজকে বলেন, ‘দুবলায় প্রতি বছর এক লাখ পর্যটক বেড়াতে যান। কেউ এক কেজি, দুই কেজি, পাঁচ কেজি শুঁটকি কেনেন। বনবিভাগের হিসাব মতে, বছরে ৪-৫ লাখ কেজি শুঁটকি পর্যটকরা কিনে নেন। তাতে কোনো রাজস্ব পায় না সরকার। অথচ সরকারি নিয়ম অনুযায়ী দুবলায় উৎপাদিত শুঁটকির প্রতি কেজিতে সাড়ে ১১ টাকা সরকারি রাজস্ব রয়েছে। পর্যটকদের কাছে বিক্রি হওয়া শুঁটকির বিশাল অংশ রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যে এবছর বনবিভাগ থেকে আমাদের চারটি ট্রান্সপোর্টকে শুঁটকি বিক্রির জন্য অনুমতি দেওয়া হয়েছে।’

জেলেদের অভিযোগ অস্বীকার করে তিনি বলেন, ‘দুবলায় বনবিভাগের অনুমোদিত ৫-৬শ অস্থায়ী ঘর রয়েছে। এতে নৌকা আছে এক হাজার থেকে ১২শ। দুবলায় যাওয়া ৯০ শতাংশ জেলের নিজেদের কোনো মূলধন নেই। ব্যবসায়ী, পাইকার ও সমিতি-এনজিও থেকে জেলেদের অগ্রিম টাকা দেওয়া হয়। আগের বছরগুলোতে পর্যটকদের কাছে শুঁটকি বিক্রিতে অরাজকতা ছিল। বেশি দাম নিতো। সেগুলো নিয়ন্ত্রণের জন্য এবার জেলেদের সরাসরি শুঁটকি বিক্রি বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে।’

‘অন্যখাতে বনবিভাগকে আলাদা টাকা দিতে হলেও পর্যটকদের কাছে বিক্রি শুঁটকিতে আলাদা টাকা দিতে হয় না বলে দাবি করেন তিনি। বলেন- ‘প্রতি কেজি শুঁটকিতে খরচ বাদে ১০০ টাকা লাভ থাকলে হয়। সে হিসাবে দোকানের লোকগুলোকে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।’

এ বিষয়ে কথা হলে বনবিভাগের দুবলা জেলেপল্লি টহল ফাঁড়ির ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা ফরেস্ট রেঞ্জার মিলটন রায় বার্তাবেলা নিউজকে বলেন, ‘এখানে আগে থেকেই আটটি ট্রান্সপোর্ট ছিল। এবছর থেকে পর্যটকদের মধ্যে ট্রান্সপোর্টগুলোর মাধ্যমে শুঁটকি বিক্রি করা হচ্ছে। ঝামেলা এড়াতে বনবিভাগ থেকে এর মধ্যে চারটি ট্রান্সপোর্টকে শুঁটকি বিক্রির দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। প্রতি কেজি শুঁটকিতে সাড়ে ১১ টাকা রাজস্ব আসে। পর্যটকরা শুঁটকি কিনলে দোকানগুলোতে রসিদ দেওয়া হয়। রসিদ বইগুলো বনবিভাগ থেকে যাচাই করে দেওয়া হয়। বই থেকে হিসাব করে রাজস্ব আদায় করা হয়।’ তবে বেশি দামে শুঁটকি বিক্রির বিষয়ে তিনি কোনো বক্তব্য দেননি।

বাগেরহাট জেলার সুন্দরবন পূর্ব বনবিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা মো. রেজাউল করিম চৌধুরী বার্তাবেলা নিউজকে বলেন, ‘ওখানে শুঁটকি কেনাবেচার জন্য অনেকের আগে থেকেই পারমিট আছে। এবার শুধু খুচরা বিক্রির জন্য দোকানগুলো দেওয়া হয়েছে। পর্যটকদের কাছে বিক্রি করা শুঁটকির রাজস্ব আমাদের দেন। এর বাইরে কোনো সুবিধা বনবিভাগ নেয় না।’

দোকানগুলোতে বাজারের চেয়ে অতিরিক্ত দাম নিতে পারেন- এমন আশঙ্কার কথা স্বীকার করে তিনি বলেন, ‘তারা অতিরিক্ত দাম নিলেও নিতে পারেন। কিন্তু রাজস্বের বাইরে আমরা কিছু দেখি না। যে দোকানগুলো বসেছে, তারা তারাই (ট্রান্সপোর্ট মালিক) আলাপ করে সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এখন যেহেতু একচেটিয়া ব্যবসার অভিযোগ আসছে, সেখানে আরও কিছু দোকান বসানোর কথা বলবো।’

Dummy Ad 1

গোপালগঞ্জের যদুপুরে মিথ্যা ও ষড়যন্ত্রমূলক মামলা থেকে রেহাই পায়নি সৌদি প্রবাসী হাচিবুর কাজী

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশিত: ১৬ মার্চ, ২০২৪

গোপালগঞ্জের যদুপুরে মিথ্যা ও ষড়যন্ত্রমূলক মামলা থেকে রেহাই পায়নি সৌদি প্রবাসী হাচিবুর কাজী

গোপালগঞ্জ  প্রতিনিধি: গোপালগঞ্জের সেই আলোচিত আদম ব্যপারী আল-আমিন কাজীর স্ত্রীর মোহসিনা আক্তারের দেওয়া মিথ্যা মামলার শিকার সৌদি আরবের মদিনা আওয়ামী লীগের সভাপতি হানিফ কাজী সহ তার পরিবারের লোকজন। 

সরেজমিনে গণমাধ্যম কর্মীদের এক ছায়া তদন্তে পাওয়া যায়। মহোসিনা আক্তার বাদি হয়ে গোপালগঞ্জ আদালতে যে মামলাটি করেছে তা সম্পূর্ন মিথ্যা ও ভিত্তিহীন। তার স্বামী আল-আমিন কাজী, বিদেশে আনা-নেওয়া ও প্রতারনার দায়ে গোপালগঞ্জ আদালত তাকে জেলে প্রেরণ করেন। স্বামীর জেলে যাওয়াটা মেনে নিতে না পেরে এই মামলাটি দায়ের করেন তিনি। মামলার দেওয়া ৫নং আসামী হাসিবুর কাজী সৌদি প্রবাসী। গোপালগঞ্জ আদালতে যখন মামলাটি হয় তখন হাসিবুর সৌদি অবস্থান করছিলেন। মামলার পরে সে বাংলাদেশে আসেন।

এ ব্যপারে সৌদি প্রবাসী হাসিবুর কাজী বলেন, আমি সৌদি আরবে চাকরি করি আমি ছুটিতে বাড়ি এসে শুনলাম আমার নামে মামলা হয়েছে। আমি বিদেশে থেকেও আল-আমিন কাজীর স্ত্রীর দেওয়া মামলায় ভুগছি এটা কোন আইন।

এ ব্যপারে মোহসিনা আক্তারে আপন চাচাতো দেবর আব্দুর রহমান কাজী, সামাদ কাজী ও আল-আমিন কাজী গণমাধ্যম কর্মীদের বলেন, এখানে কোথাও কোন গন্ডগোল হয় নাই তারা যে মামলা করেছে সম্পূর্ন মিথ্যা ও বানোয়াট আর মামলার পাঁচ নং আসাসী হাসিবুর মামলা হবার পর বিদেশ থেকে এসেছে।

কিছুদিন পূর্বে এই মামলার বাদী মোহসিনা আক্তারে স্বামীর বিরুদ্ধে আদম ব্যাপারী ও মানব পাঁচারকারী  মো. ওহাব কাজীর ছেলে মো. আল-আমিন কাজীর বিরুদ্ধে বিদেশ পাঠানোর নামে ও সৌদি লোক নিয়ে তাদের সাথে প্রতারণারসহ নানারকম হয়রানি করছে বলে সংবাদ সম্মেলনের অভিযোগ করেন ভুক্তভোগীরা। তারই ফলশ্রুতিতে সে জেল খেটে বের হয়। ধারনা করা হচ্ছে তার স্বামীর জেলে যাওয়াকে মেনে নিতে না পারায় এই মিথ্যা মামলা দিয়ে প্রতিপকক্ষকে হেও প্রতিপন্ন কারাই মূল উদ্দ্যেশ। গ্রামবাসীরা এই মামলার সাথে জড়িত বাদি সহ সকলের বিরুদ্ধে তদন্ত সাপেক্ষে বিচারের দাবী জানান।


শান্তিপূর্ণ নির্বাচনের পথে ‘বড় হুমকি’ অবৈধ অস্ত্রের ঝনঝনানি

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশিত: ১৪ জানুয়ারি, ২০২৬

শান্তিপূর্ণ নির্বাচনের পথে ‘বড় হুমকি’ অবৈধ অস্ত্রের ঝনঝনানি

নির্বাচন যত ঘনিয়ে আসছে দেশে অবৈধ অস্ত্রের ঝনঝনানি তত বাড়ছে। জনমনে ছড়াচ্ছে উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা। তৈরি হচ্ছে ভীতির পরিবেশ। প্রায় প্রতিনিয়ত দেশের বিভিন্ন জেলায় অবৈধ আগ্নেয়াস্ত্র উদ্ধার ও অস্ত্রধারীদের তৎপরতার খবর সামনে আসায় নির্বাচনকেন্দ্রিক জননিরাপত্তার প্রশ্নটি বড় হয়ে সামনে আসছে।

নির্বাচনের আগে এ ধরনের পরিস্থিতি মোকাবিলায় অন্তর্বর্তীকালীন সরকার যথারীতি তৎপরতা দেখালেও বাস্তব অবস্থার প্রত্যাশিত পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে না। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অভিযানের মধ্যেও অবৈধ অস্ত্রের অবাধ বিচরণ মানুষকে আতঙ্কগ্রস্ত করে তুলছে। জনমনে ফেলছে শঙ্কার ছায়া।

স্ত্রের এ মহড়ার দ্রুত লাগাম টানা না গেলে অবাধ ও শান্তিপূর্ণ নির্বাচনের পথ ক্রমশ কঠিন থেকে কঠিনতর হয়ে উঠতে পারে, যা একদিকে আশঙ্কা আর অনিশ্চয়তা যেমন বাড়াবে, সরকারের জন্যও তা নিয়ন্ত্রণ করা হয়ে উঠতে পারে ভীষণ চ্যালেঞ্জিং।

অপরাধ বিশেষজ্ঞরা বলছেন, খুনের ঘটনায়ও অপরাধীরা কোনো কোনো ক্ষেত্রে ধরাছোঁয়ার বাইরে থাকছে, যা আসন্ন দিনগুলোতে এই অপরাধীদের আরও বেপরোয়া করে তুলতে পারে। তফসিল ঘোষণার আগে-পরে যেসব খুনের ঘটনা ঘটেছে, তা শুধু ভোটারদেরই নয়—নির্বাচনি কার্যক্রম পরিচালনায় প্রার্থীদেরও আতঙ্কিত করে তুলতে পারে।

আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এখনো অপরাধীদের মধ্যে ভয়ের জায়গা তৈরি করতে পারেনি। অপরাধী যে রাজনৈতিক দলের পরিচয়েই থাকুক না কেন তাদের বিষয়ে যথাযথ আইনগত ব্যবস্থা নিয়ে শাস্তি নিশ্চিত করার দৃষ্টান্ত স্থাপন করা গেলে এ অবস্থা থেকে পরিত্রাণ মিলবে—মনে করছেন অপরাধ বিশেষজ্ঞরা।

অভিযানে অস্ত্র উদ্ধার

রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের সময় দেশের বহু থানা থেকে অস্ত্র লুট করা হয়েছে। সেসব অস্ত্র কী পরিমাণ উদ্ধার হয়েছে তা নিয়ে প্রশ্ন রয়ে গেছে। নতুন করে দেশের বাইরে থেকেও অস্ত্র ঢুকছে বলে আলোচনা রয়েছে। নির্বাচনের মাঠে নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠায় সেসব অস্ত্র ব্যবহার করা হবে কি না—রয়েছে এ সংশয়ও।

অভ্যুত্থান-পরবর্তী ডিএমপির এক হাজার ৮৯৮টি অস্ত্র খোয়া যায়। এর মধ্যে ৬৪১টি অস্ত্র এখনো হাতছাড়া। এখন পর্যন্ত এক হাজার ২৫৭টি অস্ত্র উদ্ধার হয়েছে।—ডিএমপির তথ্য

তবে অবৈধ অস্ত্র উদ্ধারে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তৎপরতা অব্যাহত রয়েছে। গত ১ জানুয়ারি র‌্যাব-১২ সিপিসি-৩ এর ক্যাম্প কমান্ডার কে এ এম মামুন খান চিশতী জানান, সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে ব্যবহারের উদ্দেশে অস্ত্র মজুতের গোপন সংবাদ জানতে পারে পুলিশের এলিট ফোর্স র‌্যাব। কুষ্টিয়ার দৌলতপুর এলাকায় অভিযান চালিয়ে দুটি বিদেশি পিস্তল ও পাঁচটি গুলিসহ দুজনকে গ্রেফতার করে র‌্যাব-১২।

গত ৬ জানুয়ারি ভোরে গোপন সংবাদের ভিত্তিতে ঢাকা মহানগরীর পল্লবী থানার আরমান কমিউনিটি লার্নিং সেন্টারের পাশে একটি নির্মাণাধীন ভবনে অভিযান চালিয়ে অত্যাধুনিক অবৈধ আগ্নেয়াস্ত্রসহ চার সন্ত্রাসীকে গ্রেফতার করে র‌্যাব-৪ এর একটি আভিযানিক দল।

গত বছরের ২৭ মে ভোরে কুষ্টিয়া শহরের কালীশংকরপুর এলাকায় তিন ঘণ্টার এক শ্বাসরুদ্ধকর অভিযানে তালিকাভুক্ত শীর্ষ সন্ত্রাসী সুব্রত বাইন ওরফে ফতেহ আলী ও তার ঘনিষ্ঠ সহযোগী আরেক শীর্ষ সন্ত্রাসী মোল্লা মাসুদ ওরফে আবু রাসেল মাসুদকে আটক করে সেনাবাহিনী। পরে তাদের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে রাজধানীর হাতিরঝিল এলাকা থেকে সুব্রত বাইনের অন্য দুই সহযোগী শুটার আরাফাত ও শরীফকে গ্রেফতার করা হয়। তাদের কাছ থেকে পাঁচটি বিদেশি পিস্তল, ১০টি ম্যাগাজিন, ৫৩ রাউন্ড অ্যামোনিশন এবং একটি স্যাটেলাইট ফোন উদ্ধার করা হয়।

র‌্যাব বলছে, গত তিন মাসে দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে ১৮৮টি দেশি-বিদেশি অস্ত্র উদ্ধার করা হয়েছে। গ্রেফতার করা হয়েছে ৭৯ জনকে।

পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, গণঅভ্যুত্থান পরবর্তী থানা লুটের ঘটনায় ৬৪১টি অস্ত্র এখনো পুলিশের হাতছাড়া।

অপরাধ বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, থানা থেকে লুট হওয়া এই অস্ত্রগুলো এখন সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে ব্যবহার করা হচ্ছে। তবে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ব্যবহার করা ৬৪১টি বৈধ অস্ত্রের হিসাবের বাইরে রাজধানীসহ সারাদেশে এ মুহূর্তে কী পরিমাণ অবৈধ অস্ত্র রয়েছে তার সঠিক কোনো পরিসংখ্যান নেই পুলিশের হাতে।

দু-চারটি অস্ত্র যে সীমান্ত দিয়ে ঢুকছে না আমি তা বলবো না, ঢুকছে এবং ধরাও হচ্ছে। প্রতিদিন দু-একটি করে ধরা হচ্ছে। কোথাও কোনো রকমের ছাড় দেওয়া হচ্ছে না—স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা

সেনাবাহিনী, পুলিশ বা র‌্যাবের অভিযানেই শুধু নয়—দেশের সীমান্তবর্তী বিভিন্ন এলাকা থেকেও অস্ত্র উদ্ধার এখন যেন নিয়মিত ঘটনা হয়ে দাঁড়িয়েছে। এসব অস্ত্র ব্যবহার করে ঘটছে খুনের ঘটনা।

হরহামেশা প্রকাশ্যে গুলি করে হত্যা

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার মাত্র একদিন পরই গত ১২ ডিসেম্বর রাজধানীতে দিনদুপুরে প্রকাশ্যে গুলি করা হয় ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র শরিফ ওসমান হাদিকে। তিনি ঢাকা-৮ আসনে সংসদ সদস্য প্রার্থী হওয়ার ঘোষণা দিয়েছিলেন। সিঙ্গাপুরে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ১৮ ডিসেম্বর হাদি মারা যান।

হাদিকে গুলির ঘটনার মাত্র একদিন আগেই ১১ ডিসেম্বর দুপুরে পুরান ঢাকার শ্যামবাজারে আবদুর রহমান ভূঁইয়া (৫৫) নামের এক মসলা ব্যবসায়ীকে দোকানে ঢুকে প্রকাশ্যে গুলি করে হত্যা করে দুর্বৃত্তরা।

গত ১৭ নভেম্বর সন্ধ্যায় রাজধানীর পল্লবীতে একটি হার্ডওয়্যারের দোকানে ঢুকে মুখোশ ও হেলমেট পরা সন্ত্রাসীরা পল্লবী থানা যুবদলের সদস্যসচিব গোলাম কিবরিয়াকে গুলি করে হত্যা করে। ১২ নভেম্বর মধ্য বাড্ডার কমিশনার গলির একটি দোতলা টিনশেড বাড়িতে গুলিবিদ্ধ হন মামুন শিকদার (৩৯) নামের এক ব্যক্তি।

বিদায়ী বছরের শুরুর দিকে গত ২৩ ফেব্রুয়ারি রাতে রাজধানীর বনশ্রী ডি ব্লকের ৭ নম্বর রোডের ২০ নম্বর বাড়ির সামনে সোনা ব্যবসায়ী আনোয়ার হোসেনকে (৪৩) ফিল্মি স্টাইলে গুলি ও ছুরিকাঘাত করে প্রায় ১৬০ ভরি সোনা ও নগদ এক লাখ টাকা ছিনিয়ে নেয় দুর্বৃত্তরা।

গত ২৫ মে রাতে বাড্ডা এলাকায় বন্ধুদের সঙ্গে দোকানের সামনে বসে চা পান করছিলেন বিএনপি নেতা কামরুল আহসান সাধন। হঠাৎ দুজন লোক তাকে প্রকাশ্যে গুলি করে হত্যা করে। পরে এ হত্যাকাণ্ডের পেছনে আন্ডারওয়ার্ল্ডের গডফাদারের সংশ্লিষ্টতার তথ্য উঠে আসে।

২০২৪ সালে দেশে ৬৪৯টি রাজনৈতিক সহিংসতায় ১০০ জনের প্রাণহানি হয়েছে। ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত ৪০১টি রাজনৈতিক সহিংসতায় খুন হয়েছেন ১০২ জন।—আইন ও সালিশ কেন্দ্রের তথ্য

গত বছরের ১১ নভেম্বর পুরান ঢাকায় প্রকাশ্যে গুলি করে হত্যা করা হয় তারেক সাইদ মামুনকে। চারদিন পরই ১৫ নভেম্বর লক্ষ্মীপুরের চন্দ্রগঞ্জের পশ্চিম লতিফপুর এলাকায় ওয়ার্ড বিএনপির সাধারণ সম্পাদক আবুল কালামকে গুলি করে হত্যা করে দুর্বৃত্তরা।

নতুন বছরের শুরুতেই গত ৩ জানুয়ারি যশোর শহরের শংকরপুর এলাকার বাসিন্দা যশোর পৌরসভার ৭ নম্বর ওয়ার্ড বিএনপির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আলমগীর হোসেনকে (৫৫) মাথায় গুলি করে হত্যা করা হয়।

এর দুদিন পর ৫ জানুয়ারি যশোরের মনিরামপুরের বরফকল ব্যবসায়ী রানা প্রতাপ বৈরাগীকে (৩৮) ডেকে নিয়ে খুব কাছ থেকে মাথায় গুলি করে হত্যা করা হয়। একই দিন চট্টগ্রামের রাউজানে যুবদলের এক সাবেক নেতাকে গুলি করে হত্যা করে দুর্বৃত্তরা।

সারাদেশে অবৈধ অস্ত্রের ছড়াছড়ি

অভ্যুত্থান-পরবর্তীকালে রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে থানার অস্ত্র লুট করে নেয় দুর্বৃত্তরা। লুট হওয়া এসব অস্ত্র উদ্ধারের বিষয়ে জানতে চাইলে ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) মিডিয়া অ্যান্ড পাবলিক রিলেশন্স বিভাগের উপকমিশনার মুহাম্মদ তালেবুর রহমান জাগো নিউজকে বলেন, ‘অভ্যুত্থান-পরবর্তী আমাদের ডিএমপির এক হাজার ৮৯৮টি অস্ত্র খোয়া যায়। এর মধ্যে ৬৪১টি অস্ত্র এখনো হাতছাড়া। এখন পর্যন্ত এক হাজার ২৫৭টি অস্ত্র উদ্ধার হয়েছে।’

পুলিশের ব্যবহৃত লুণ্ঠিত অস্ত্র ছাড়াও অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, বিভিন্ন সময়ে অনেক অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার হয়েছে। এগুলোর সঠিক তথ্য অনুমানের ওপর ভিত্তি করে বলা যাবে না।

অস্ত্র জমা দিতে সরকারের নির্দেশনা ও পুরস্কার ঘোষণা

সরকারের পক্ষ থেকে বারবার লুণ্ঠিত অস্ত্র জমা দেওয়ার নির্দেশনা দিয়েও কোনো কাজ না হওয়ায় এবং নির্বাচন ঘনিয়ে আসায় দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে লুট হওয়া এসব অস্ত্র উদ্ধারে পুরস্কার ঘোষণা করে সরকার।

২০২৫ সালের জানুয়ারিতে ২৯৪, ফেব্রুয়ারিতে ৩০০, মার্চে ৩১৬, এপ্রিলে ৩৩৬, মে মাসে ৩৪১, জুনে ৩৪৪, জুলাইয়ে ৩৬২, আগস্টে ৩২১, সেপ্টেম্বরে ২৯৭, অক্টোবরে ৩১৯ ও নভেম্বরে খুনের ঘটনায় মামলা হয়েছে ২৭৯টি। অর্থাৎ, বিদায়ী বছরে ১১ মাসে মোট খুনের মামলা হয়েছে তিন হাজার ৫০৯টি।—পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্য

গত ৬ জানুয়ারি পুলিশ সদর দপ্তরের এআইজি (মিডিয়া অ্যান্ড পিআর) এ এইচ এম শাহাদাত হোসেন এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলেন, পুলিশের লুণ্ঠিত অস্ত্র ও গোলাবারুদের প্রকৃত সন্ধানদাতাদের পাঁচ লাখ টাকা পর্যন্ত দেওয়া হবে।

পুরস্কারের পরিমাণ জানিয়ে তিনি বলেন, এলএমজিতে পাঁচ লাখ, এসএমজিতে দেড় লাখ, চায়না রাইফেলে এক লাখ এবং পিস্তল ও শটগানে ৫০ হাজার টাকা করে দেওয়া হবে। প্রতি রাউন্ড গুলির জন্যও পুরস্কার থাকছে ৫০০ টাকা।

লুণ্ঠিত অস্ত্র ও গোলাবারুদের প্রকৃত সন্ধানদাতাকে কাছের থানায় যোগাযোগ করতে বলেছে পুলিশ

নির্বাচন ঘিরে সীমান্ত দিয়ে ঢুকছে অবৈধ অস্ত্র

স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী গত ২৯ ডিসেম্বর জানিয়েছেন, জাতীয় নির্বাচন টার্গেট করে সীমান্ত দিয়ে অবৈধ অস্ত্র বাংলাদেশে প্রবেশ করছে।

‘দু-চারটি অস্ত্র যে সীমান্ত দিয়ে ঢুকছে না তা আমি বলবো না, ঢুকছে এবং ধরাও হচ্ছে। প্রতিদিন দু-একটি করে ধরা হচ্ছে। কোথাও কোনো রকমের ছাড় দেওয়া হচ্ছে না’—সাংবাদিকদের প্রশ্নে বলেন স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা।

তিনি বলেন, জাতীয় নির্বাচনের জন্য সব ধরনের প্রস্তুতি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় নিচ্ছে। প্রায় ৩৫ হাজার বিজিবি সদস্য নির্বাচনে মোতায়েন থাকবেন। শঙ্কার প্রশ্নে তিনি বলেন, নির্বাচনে এখন কোনো শঙ্কা নেই।

প্রশাসনেও শঙ্কার ছাপ

অবৈধ অস্ত্র আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনে কতটা প্রভাব ফেলতে পারে বা কোনো আশঙ্কা আছে কি না—জানতে চাইলে পুলিশের একজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জাগো নিউজকে বলেন, দেশে অবৈধ অস্ত্র কী পরিমাণ আছে সেটা তো বলা মুশকিল। আমাদের যদি জানা থাকতো যে এখানে ১০০টি অবৈধ অস্ত্র আছে তাহলে সেই অস্ত্রগুলো রিকোভারি করতাম। শুধু নির্বাচন নয়, যে কোনো সময় অবৈধ অস্ত্র দেশের জন্য অবশ্যই একটা থ্রেট। তবে নির্বাচনে মনে হয় না এটির খুব বেশি প্রভাব পড়বে।

র‌্যাবের অভিযানে অস্ত্র উদ্ধার

র‌্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়নের (র‌্যাব) মহাপরিচালক এ কে এম শহিদুর রহমান বলেন, ‘অস্ত্র উদ্ধারে আমাদের অভিযান অব্যাহত আছে। গত তিন মাসে (অক্টোবর-ডিসেম্বর) দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে আমরা ১৮৮টি দেশি ও বিদেশি অস্ত্র উদ্ধার করি। এ সংক্রান্ত ৭৯ জনকে গ্রেফতার করি। এই তিন মাসে আমরা হত্যা মামলার ৫২২ জন আসামিকে গ্রেফতার করি। এছাড়া ডাকাতি মামলার ১৫১ জন, ছিনতাইবিরোধী অভিযানে ৭০ জন, মানবপাচারকারী ৪১ জন এবং মাদক মামলায় এক হাজার ২১০ জনকে গ্রেফতার করি। তিন মাসে আমরা মোট চার হাজার ৩৬৬ জন অভিযুক্তকে গ্রেফতার করতে সক্ষম হয়েছি।’

অপরাধীরা দেখছে গুলি বা হামলা করে খুব একটা বাধার মুখে পড়তে হচ্ছে না। বরং হামলা নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে রেষারেষির প্রতিযোগিতা চলছে। মামলা নিয়ে এমন প্রতিযোগিতা চললে অপরাধীরা সুযোগ নেওয়ার চেষ্টা করবে—এটিই স্বাভাবিক।—অপরাধ বিশেষজ্ঞ ড. তৌহিদুল হক

নির্বাচন সামনে রেখে র‌্যাবের প্রস্তুতি ও সক্ষমতা জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আমরা মনে করি আমাদের যে জনবল ও লজিস্টিক সাপোর্ট এটির সর্বোচ্চ ব্যবহার করে নির্বাচনি দায়িত্ব পালন করতে সক্ষম হবো।’

‘আমাদের নয় হাজারের কাছাকাছি জনবল রয়েছে। এ নিয়েই আমরা আমাদের দায়িত্ব পালন করবো। স্ট্রাইকিং ফোর্স হিসেবে কাজ করবো। ভোটকেন্দ্রে পুলিশ ও আনসার থাকবে। স্ট্রাইকিং ও মোবাইল ডিউটি হিসেবে বিজিবি এবং সেনাবাহিনী স্ট্রাইকিং ফোর্স হিসেবে দায়িত্ব পালন করবে’—যোগ করেন র‌্যাবের মহাপরিচালক।

রাজনৈতিক সহিংসতায় অবৈধ অস্ত্র

মানবাধিকার সংগঠন আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) তথ্যমতে, ২০২৪ সালে দেশে ৬৪৯টি রাজনৈতিক সহিংসতায় ১০০ জনের প্রাণহানি হয়েছে। ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত ৪০১টি রাজনৈতিক সহিংসতায় খুন হয়েছেন ১০২ জন।

হত্যা মামলার পরিসংখ্যান ও বিশ্লেষণ

পুলিশ সদর দপ্তরের পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে দেশে ২৯৭টি খুনের মামলা হয়। অক্টোবরে এ সংখ্যা ছিল ৩২০। অর্থাৎ, সেপ্টেম্বরের তুলনায় অক্টোবরে খুনের মামলা বাড়ে ২৩টি। ২০২৪ সালের অক্টোবরে সারাদেশে খুনের মামলা হয়েছিল ৩৯৯টি।

গত বছরের সেপ্টেম্বর ও অক্টোবরের খুনের মামলা বিশ্লেষণে দেখা যায়, মেট্রোপলিটন এলাকাগুলোর মধ্যে অক্টোবরে ঢাকায় ২২টি ও গাজীপুরে ১১টি খুনের মামলা হয়। তবে সেপ্টেম্বরে ঢাকায় এ সংখ্যা ছিল ২৫টি ও গাজীপুরে তিনটি। পুলিশ রেঞ্জগুলোর মধ্যে অক্টোবরে ঢাকা রেঞ্জে ৫৯টি হত্যা মামলা হয়েছিল। চট্টগ্রাম রেঞ্জে সেপ্টেম্বরে ৫৫টি হত্যা মামলা হলেও অক্টোবরে তা বেড়ে হয় ৫৯টি। এসময়ে খুলনা রেঞ্জে ৩৪টি ও রাজশাহী রেঞ্জে হত্যা মামলা হয় ৪১টি।

খুনের ঘটনায় ১১ মাসে যত মামলা

২০২৫ সালের জানুয়ারিতে ২৯৪টি, ফেব্রুয়ারিতে ৩০০টি, মার্চে ৩১৬টি, এপ্রিলে ৩৩৬টি, মে মাসে ৩৪১টি, জুনে ৩৪৪টি, জুলাইয়ে ৩৬২টি, আগস্টে ৩২১টি, সেপ্টেম্বরে ২৯৭টি, অক্টোবরে ৩১৯টি ও নভেম্বরে খুনের ঘটনায় ২৭৯টি মামলা হয়েছে। অর্থাৎ, বিদায়ী বছরে ১১ মাসে মোট খুনের মামলা হয়েছে তিন হাজার ৫০৯টি।

২০২৪ সালের একই সময়ে (জানুয়ারি থেকে নভেম্বর) খুনের মামলা হয়েছিল তিন হাজার ২২৮টি।

যা বলছেন বিশেষজ্ঞরা

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক ও অপরাধ বিশেষজ্ঞ ড. তৌহিদুল হক জাগো নিউজকে বলেন, তফসিলের আগে চট্টগ্রামে একজন প্রার্থীকে গুলি করে সন্ত্রাসীরা, তফসিলের একদিন পর গণঅভ্যুত্থানের অন্যতম সংগঠক ওসমান হাদির ওপর যে আক্রমণ—সন্দেহ নেই এসব ঘটনা প্রার্থীদের আতঙ্কে রাখবে।

তিনি বলেন, রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীদের মধ্যে ভয়ভীতি কাজ করবে এবং নির্বাচনি প্রচার-প্রচারণায় অংশগ্রহণের ক্ষেত্রে ভোটারদের এক ধরনের দ্বিধা-দ্বন্দ্বে রাখবে। কারণ, মানুষের ভোটাধিকারের চেয়ে জীবনের মূল্য অনেক বেশি। চট্টগ্রামে প্রার্থীর ওপর গুলির ঘটনার পরই যদি সরকার বা আইনশৃঙ্খলা বাহিনী জোরালোভাবে ব্যবস্থা নিতে পারতো তবে এখনকার পরিস্থিতি হয়তো দেখতে হতো না।

এ অপরাধ বিশেষজ্ঞের মতে, অপরাধীরা দেখছে গুলি বা হামলা করে খুব একটা বাধার মুখে পড়তে হচ্ছে না। বরং তাদের হামলা নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে রেষারেষির প্রতিযোগিতা চলছে। কোনো হামলা, আক্রমণ বা অপরাধ নিয়ে যখন রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে রেষারেষির প্রতিযোগিতা চলে তখন অপরাধীরা সুযোগ নেওয়ার চেষ্টা করবে এটিই স্বাভাবিক।

‘আইনশৃঙ্খলা বাহিনী এখনো অপরাধীদের মধ্যে ভয়ের জায়গা তৈরি করতে পারেনি। অপরাধী যে রাজনৈতিক দলের পরিচয়েই থাকুক না কেন তাদের বিষয়ে আইনগত ব্যবস্থা নিয়ে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে পারলে এ অবস্থা থেকে পরিত্রাণ মিলবে’—যোগ করেন ড. তৌহিদুল হক।

জানতে চাইলে পুলিশের সাবেক মহাপরিদর্শক (আইজিপি) মোহাম্মদ নুরুল হুদা জাগো নিউজকে বলেন, সবার কাছে তো অস্ত্র থাকে না। অস্ত্রের নির্দিষ্ট তথ্যগুলো যদি আইনশৃঙ্খলা বাহিনী জোগাড় করতে পারে তবে সেগুলো উদ্ধার করা সহজ হয়। এজন্য জনসাধারণের সাহায্য দরকার।

‘এর চেয়েও অতীতে আরও খারাপ অবস্থার সৃষ্টি হয়েছিল। টেনশনের কোনো কারণ নেই। সুষ্ঠু নির্বাচনের জন্য আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ভালো থাকতে হয়। অবৈধ অস্ত্রগুলো নির্বাচনের আগে দ্রুত উদ্ধার করা দরকার। অস্ত্র উদ্ধারের নানান পথ আছে। সেগুলো আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে অ্যাপ্লাই করতে হবে’—বলেন সাবেক এই পুলিশপ্রধান।



কেশরহাটে অনুমোদনহীন সমিতির উচ্চ সুদে সর্বশান্ত অনেক পরিবার

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশিত: ১০ মার্চ, ২০২৪

কেশরহাটে অনুমোদনহীন সমিতির উচ্চ সুদে সর্বশান্ত অনেক পরিবার

রাজশাহী প্রতিনিধি: রাজশাহীর মোহনপুর উপজেলার কেশরহাটে অনুমোদনহীন ব্যবসায়িক সমিতির আড়ালে চলছে উচ্চ হারে সুদের রমরমা ব্যবসা। সরকারকে রাজস্ব ফাঁকি দিয়ে অসহায় মানুষের সাথে প্রতারণা করে চালানো হচ্ছে এই সুদের কারবার। বড় অংকের সুদের কারণে ব্যবসায়ী থেকে শুরু করে নিম্ন পর্যায়ের দিনমজুরেরা হচ্ছেন সর্বশান্ত ।

সরেজমিন গিয়ে জানা যায়, কেশরহাট পৌরসভার গোপইল গ্রামের সাজ্জাদ মাষ্টারের ছেলে রাজু। একসময় ছিলেন মুদি দোকানদার। মুদি ব্যবসার আড়ালে তিনি ফেন্সিডিলের ব্যবসাও করতেন এবং নকল সিগারেট ও ফেন্সিডিল’সহ বেশ কয়েকবার আটকও হয়েছিলেন মোহনপুর থানায়।

এরপর তিনি কোন সনদপত্র না নিয়েই কেশরহাটে ‘সাফল্য সমবায় সমিতি’ নামের একটি প্রতিষ্ঠান খুলে বসেন। সুদ বইয়ের মাধ্যমে রাজু তার অবৈধ দাদন ব্যবসাকে বৈধ দেখিয়ে মোহনপুর-কেশরহাটের সাধারন মানুষদের প্রতারিত করছেন। সাধারণ মানুষ প্রতারিত হলেও দিন দিন আঙ্গুল ফুলে কলা গাছ বনে গেছে রাজু।

অতিরিক্ত সুদ আদায় এবং সরকারি আইন ভঙ্গ করলেও স্থানীয় সমবায় অফিস কোনো পদক্ষেপ না নেয়ায় গ্রাহকরা প্রতারণার শিকার হচ্ছেন এবং অতিরিক্ত সুদ প্রদানের মাধ্যমে সর্বশান্ত হচ্ছেন। সংশ্লিষ্ট কতৃপক্ষ কোনো পদক্ষেপ না নেওয়ায় বেপরোয়া হয়ে উঠেছে সুদ কারবারিরা।

সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, কেশরহাট বাজার সংলগ্ন মসজিদ মার্কেটে নামবিহীন অফিস খুলে সুদের ব্যবসা চালাচ্ছে এই ‘সাফল্য সমবায় সমিতি’।

আরোও জানা যায়, সাফল্য সমবায় সমিতির পরিচালক রাজু মোড়া অংকের লাভে ও ব্যাংক চেকের বিনিময়ে সাধারণ মানুষের কাছে টাকা দেন। সুদের ব্যবসা করে এখন সে কোটিপতি। প্রায় ৫০ লক্ষ টাকা বিভিন্ন সাধারণ মানুষের কাছে সুদে দেওয়া রয়েছে তার।

ঋণ প্রদানে সমবায় সমিতির পরিচালক রাজু সাধারণ মানুষদের কাছ থেকে সাদা স্ট্যাম্প ও ব্ল্যাক চেক বইয়ের পাতা এবং স্বাক্ষর করা ফাঁকা ৩০০ টাকার নন-জুডিশিয়াল স্ট্যাম্প রেখে দিচ্ছেন টাকা দেন তিনি। টাকা পরিশোধ করার পরও চেক বইয়ের পাতায় নিজেদের ইচ্ছা মত টাকা বসিয়ে আদালতে মামলা করে গ্রাহক হয়রানির বহু অভিযোগ রয়েছে এ সমিতির বিরুদ্ধে।

২০১৮ সালে প্রতিষ্ঠানটি প্রতিষ্ঠার পর থেকে পরিচালক রাজু দীর্ঘ ৫ বছর যাবৎ সমবায় অধিদপ্তরের সরকারি পরিপত্রের তোয়াক্কা না করেই সদস্যদের কাছ থেকে অতিরিক্ত সুদ আদায়, সাদা চেক ও স্ট্যাম্প এর বিপরীতে ঋণ প্রদান করেন, এমনই অভিযোগ ভুক্তভোগীদের।

তথ্যনুসন্ধানে আরো জানা যায়, মোহনপুর উপজেলার সমবায় অফিসের অধীনে নামে বেনামে অনেক সমিতি রয়েছে, এছাড়া সমাজ সেবা অধিদপ্তর থেকে রেজিষ্ট্রেশন প্রাপ্ত আরও শতাধীক সমিতি রয়েছে। যাদের অধিকাংশই চড়া সুদে ঋণ বিতরণ করে থাকেন। এর মধ্যে অন্যতম কেশরহাটে রাজুর ‘সাফল্য সমবায় সমিতি’ লিমিটেড নামের প্রতিষ্ঠান। সমবায় সমিতি হিসেবে রেজিস্ট্রেশন না নিয়েও সমবায় অধিদপ্তরের কোন আইন কানুনই মানছে না প্রতিষ্ঠানটি।

কেশরহাট বাজারে কয়েকজন ব্যবসায়ী জানান, ‘সাফল্য সমবায় সমিতি’এর পরিচালক রাজু লাভের ওপর এককালীন টাকা দিয়ে মাত্র এক মাস বা তিন মাস মেয়াদে ঋণ পরিশোধ করতে বাধ্য করেন । এতে ঋণ নিয়ে চরম বিপদে পড়েছেন সাধারণ অসহায় মানুষ।

আরোও এক ব্যবসায়ী কান্নাস্বরে জানান, রাজুর কাছে সুদে ৪ লক্ষ টাকা নিয়ে প্রতি মাসে ৪০ হাজার টাকা তাকে লাভ দিতেন। টাকা না দেওয়ার কারনে ওই সুদ ব্যবসায়ী তাকে মোবাইল ফোনে বিভিন্ন ভাবে হুমকি দিয়ে আসছিলেন। ক্ষতিগ্রস্থ ব্যবসায়ী এখন অসহায় অবস্থায় জীবন যাপন করছেন। ব্যবসা বন্ধ করে নিজের জমি জমা বিক্রি করে ওই সুদ ব্যবসায়ীর টাকা দিতেও হিমসিম খেতে হচ্ছে তাকে।

শুধু তাই নই, রাজশাহীর সাহেব বাজারের আরোও এক ব্যবসায়ীর সাথেও প্রতারনা করে প্রায় ৪ লক্ষ টাকা চিট করে নিয়েছে এই সাফল্য সমবায় সমিতির পরিচালক রাজু। এরপর সেই ভুক্তভোগী কেশরহাট পৌরসভায় একটি অভিযোগ দায়ের করেন।

এ বিষয়ে মোহনপুর উপজেলা সমবায় কর্মকর্তা ও সমাজসেবা কর্মকর্তা আনিছা দেলোয়ারা আঞ্জু জানান, কেশরহাটে ‘সাফল্য সমবায় সমিতির’ কোন নিবন্ধন নাই। যেহেতু নিবন্ধন নাই সেহেতু কেউ যদি তার কাছে প্রতারিত হয় তাহলে এর জন্য আমরা দায়ী নই।

মোহনপুর উপজেলার ইউএনও আয়েশা সিদ্দিকা জানান, আমার এ বিষয়ে জানা ছিলোনা। বিস্তারিত আমি খোঁজ নিয়ে তদন্ত করে দেখবো এবং যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহন করবো।

মোহনপুর থানার অফিসার ইনচার্জ(ওসি) হরিদাস মন্ডল জানান,এ বিষয়ে লিখিত কোন অভিযোগ পেলে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহন করা হবে।

কেশরহাট পৌরসভার মেয়র শহিদুজ্জামান শহিদ জানান, সাফল্য সমবায় সমিতির কোন ট্রেড সনদপত্র নেই। এ বিষয়ে আমি যতটুকু জানি রাজু একজন চিট। তার নামে অনেক অভিযোগ রয়েছে। কিছুদিন আগে একজন ব্যক্তির মোটা অংকের টাকা প্রতারনা করে নেওয়ার লিখিত অভিযোগ পাওয়ায় তাকে আমি ডেকে এনে সময় সাপেক্ষে

পৌরসভাতেই মিমাংসা করে দেই। এই রাজুর খপ্পরে পরে যেন আর কেউ প্রতারিত না হয় সেইদিকে আমি খেয়াল রাখব।

এ বিষয়ে সাফল্য সমবায় সমিতির পরিচালক রাজুর সাথে একাধিকবার যোগাযোগ করলে তিনি কোন বক্তব্য দিতে রাজি হননি।